কে এই মাদক ব্যবসায়ী কোটিপতি চেয়ারম্যান টিপু?

শাহিদ রানা টিপু ওরফে টিপু সুলতান কয়েক বছর আগেও ছিলেন দিনমজুর, স্থানীয় ভাষায় ‘কামলা’। এখন আঙুল ফুলে তিনি কলাগাছ! এলাকায় নাম হয়েছে ‘ল্যাংড়া টিপু’ ও ‘ইয়াবা টিপু’। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মাদক কারবারীর ৪৩ জনের তালিকার প্রথম নামটি তার। এর পরও তিনি সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান! এলাকার বিভিন্ন সোর্স মতে, সীমান্তে হেরোইন পাচার দিয়ে শুরু হয়েছিল। টিপু ও তার সহযোগীরা এখন উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকা পর্যন্ত মাদকের কারবার করছে।

গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টিপু চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল ওদুদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন একসময়। একসময় পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধের কারণে টিপুকে মাদকের গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এমপি ওদুদ। ওদুদ ছাড়াও আরো চারজন মাদক কারবারীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত। তারা হলেন—গোমস্তাপুর উপজেলা পরিষদে র চেয়ারম্যান ও বিএনপির সভাপতি আলীনগর গ্রামের বাইরুল ইসলাম, ভোলাহাট উপজেলার মুশরিভাজা গ্রামের বিএনপি নেতা মোজাম্মেল হক চুনু, নাচোল উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পারচৌকা গ্রামের বাসিন্দা ও মনাকষা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা সরওয়ার জাহান সেরফান।

সম্প্রতি মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর দেখা যায় না টিপুকে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি (ওদুদ) ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করিয়েছে। মামলা দিছে। আমি মাদক ব্যবসা করি না।’ যশোর ও ঢাকায় কয়েক বছর আগে মাদক মামলার উদাহরণ দিয়ে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ‘আগে করতাম। এখন ছেড়ে দিয়েছি। ওসব মামলাও শেষ করে ফেলেছি।’

এদিকে সংসদ সদস্য আবদুল ওদুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সে (টিপু) করে কি না তা পুলিশ আর এলাকার লোকই ভালো জানে। তবে তালিকায় নাম আসা নিয়ে কথা বলতে চাই না! যারা প্রতিবাদ করছে তাদের নামও এসে যাচ্ছে।’ মাদক কারবারিদের মদদদান ও টিপুর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে জানতে চাইলে ওদুদ আরো বলেন, ‘প্রথম দিকে জানতাম না টিপু এসবে জড়িত। পরে শুনেছি, ইয়াবা কারবার করে সে টাকার মালিক হয়েছে। চেয়ারম্যান হয়েছে। একজন চেয়ারম্যান এমপির কাছে আসবে এটাই স্বাভাবিক। জানার পর এড়িয়ে চলতাম। এ ছাড়া আর কোনো বিরোধ নেই।’

টিপু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কটাপাড়া গ্রামের আবু বাক্কার ওরফে ঝাটুর ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি চারটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এক ডজন মাদক চালান ধরা পড়ার পর তার নাম উঠে আসে এবং প্রভাব খাটিয়ে বা টাকা দিয়ে তিনি বরাবরই আড়ালে থেকে যান। তবে গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় তার নাম শীর্ষে রয়েছে। হেরোইন ও ফেনসিডিলের বিক্রেতা হিসেবে মাদক কারবার শুরু করেন টিপু, পরে ইয়াবা হাতে নেন।

অভিযোগ আছে, পুলিশের সহায়তা নিয়েই রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে ইয়াবা ও হেরোইনের চালান পাচার করেন টিপু। তাঁকে আটক করতে গিয়ে উল্টো পুলিশকেই শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল। তার সন্ধানে যাওয়ার ‘অপরাধে’ একাধিক পুলিশ সদস্যকে বদলি হতে হয়েছে। কিছু পুলিশ সদস্য আবার স্বেচ্ছায় অন্য জেলায় গেছেন ক্ষোভে।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি টিপুকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। সদর উপজেলাবাসীর ব্যানারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এ ছাড়া চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের একাধিক নির্বাচিত সদস্য মাদক মামলার আসামি। সম্প্রতি ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্যকে তিন হাজার তিন পিস ইয়াবাসহ আটক করে র‌্যাব।

জানা যায়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানায় দায়ের মাদকের একাধিক মামলায় আসামি হলেও অভিযোগপত্র থেকে রেহাই পেয়ে যান টিপু। ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি ও ১১ জুন এবং ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দায়েরকৃত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তিনটি মামলার এজাহারেই তাঁর নাম ছিল, নেই আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে।

জানা গেছে, ২০১৪ সালে র‌্যাব-৪ এক লাখ ৭৮ হাজার ২০০ পিস ইয়াবাসহ একটি ট্রাক (যশোর-ট ১১-১০২৭) আটক করে। ওই মামলায় টিপু এজাহারভুক্ত ২ নম্বর আসামি। ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শ্রীবাস চন্দ্র দাস তাঁকে বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ ছাড়া সম্প্রতি বোমা হামলা চালিয়ে সুন্দরপুর ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা নামোপাড়া গ্রামের আইয়ুব আলী নামে এক নিরীহ দিনমজুর হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে টিপুর বিরুদ্ধে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক ওমর খৈয়ম জানান, টিপু প্রধান আসামি। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। স্থানীয় পুলিশের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে এমপি ওদুদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন টিপু। এ কারণে তাঁকে সমীহ করা হতো। তবে বেশ কিছুদিন ধরে টিপুর বিরুদ্ধে এবং মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছেন এমপি।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলার ৪৩ মাদক কারবারির মধ্যে টিপুর পরেই অবস্থান তার সহযোগী কৃষ্টপুর মাঝপাড়ার রুহুল আমিনের। তিনি জেলা প্রজন্ম লীগের সভাপতি। আগে কিছুই ছিল না। এখন নতুন নতুন গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। এ ছাড়া আলীনগর গ্রামের রুবেল এলাকায় চোলাই মদের কারবারি বলে পরিচিত। বটতলার আবদুল আজিজ ফেনসিডিল ও মদ এবং গোবরাতলার নাজু কারবারি হিসেবে চিহ্নিত। নাজু একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ঘোড়াস্ট্যান্ডের মান্নুকে মানুষ ফেনসিডিলের ডিলার হিসেবে জানে। এ ছাড়া রামকেস্টপুরের গলে এবং বাতেন খাঁ মোড়ের পারভীন এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞী বলে পরিচিত।

এদিকে স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিবহন রুটে মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করছেন ‘হোয়াইট কালার’ কারবারি আনোয়ার হোসেন আনার। তিনি ট্রাক ও ট্যাংকলরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি তাঁর ভাগ্নে এরতাজকে সিরাজগঞ্জ দুই কেজি হোরোইনসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জানতে চাইলে আনার বলেন, ‘আমার শত্রু আছে। তারা এসব বলছে।’

পুলিশ ও গোয়েন্দা তালিকা অনুযায়ী পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা সবাই এসব তথ্য ভুয়া বলে দাবি করেছেন। নাচোল উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি কসবা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলাম ১২ বছর। উপজেলা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান হয়েছি। একটি কলেজের শিক্ষকও। আমার বিরুদ্ধে এমন কথা কেউ কখনো বলতে পারেনি। ষড়যন্ত্র করে এসব করা হচ্ছে। প্রমাণ দিতে পারলে আমি সব পদ ছেড়ে দেব।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) টি এম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জড়িত কা্উকে ছাড় দেওয়া হবে না। টিপুর দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’ সূত্রঃ যুগান্তর